আগুরী বা উগ্রক্ষত্রিয়রা একটি বাঙালি হিন্দু জনগোষ্ঠী। রাঢ়বঙ্গের সঙ্গে, বিশেষত বর্ধমান এবং পার্শ্ববর্তী বীরভূম, বাঁকুড়া ও হুগলি জেলার সঙ্গে তাঁদের নিবিড় ঐতিহাসিক সম্পর্ক রয়েছে। এই ইতিহাসে গ্রামজীবন, কৃষিকাজ, সৈনিকবৃত্তি, ব্যবসা, শিক্ষা এবং বাংলার জনজীবনে অবদান পরস্পরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে।[১][২]
শিকড়, সৈনিকবৃত্তি ও বসতি
আমাদের উৎপত্তি-বিষয়ক প্রবন্ধে যুক্তি দেওয়া হয়েছে যে আগুরীরা সম্ভবত বর্ধমান রাজের নগদ বেতনভোগী নগদী বাহিনীর বংশধর। প্রবন্ধটি বাহিনীর গঠনকে ১৬৯৬ সালের অস্থিরতার সঙ্গে এবং অষ্টাদশ শতাব্দীতে তার কাজকে মারাঠা হানা-সহ বিভিন্ন বিপদের বিরুদ্ধে রাজের প্রতিরক্ষার সঙ্গে যুক্ত করে। এই ব্যাখ্যা অনুযায়ী, নগদ বেতন ইঙ্গিত করে এমন ভাড়াটে সৈন্যদের দিকে, যাঁদের প্রথমে স্থানীয় জমি ছিল না।
১৭৬৩ থেকে ১৮০৯ সালের মধ্যে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাহিনীটি ক্রমশ ছোট করে আনার সঙ্গে সঙ্গে প্রাক্তন সৈন্যরা কৃষিকাজ ও ভূমিস্বত্বের দিকে ঝুঁকেছিলেন। তাঁদের অনেকে ৩০–১০০ একর জমির অধিকারী শক্তিশালী কৃষক হয়ে জোতদার শ্রেণিতে যোগ দেন। ১৮৯১ সালে রিজলি লিখেছিলেন, অনেক আগুরীর জমিদারি ও বিভিন্ন স্তরের ভূমিস্বত্ব ছিল এবং অধিকাংশই ছিলেন মোটামুটি সচ্ছল কৃষক।[১][৩]
বর্ধমানে জনগোষ্ঠীটির কেন্দ্রীভবন এই ব্যাখ্যাকে সমর্থন করে: ১৮৭২–১৯২১ সালের জনগণনাগুলিতে বাংলার আগুরীদের ৭৩–৮৭ শতাংশ এই জেলায় বাস করতেন।[১] প্রবন্ধে চণ্ডীমঙ্গলের পঙ্ক্তিটিও নতুন করে বিচার করা হয়েছে এবং “উগ্রক্ষত্রিয়”কে পরবর্তী কালের নাম হিসেবে দেখানো হয়েছে—১৮৭০-এর দশক থেকে এর লেখ্য সাক্ষ্য পাওয়া যায় এবং ১৯৩১ সালের জনগণনায় নামটি গৃহীত হয়। সম্পূর্ণ যুক্তি, ঘটনাক্রম ও তথ্যসূত্রের জন্য পড়ুন নগদী থেকে জোতদার।
জমি, উদ্যোগ ও সমাজ
অনেক পরিবারের জীবনে কৃষিকাজ প্রধান ছিল। অন্যেরা শস্যের ব্যবসা, ঋণদান, চালকল ও খনিশিল্পে যুক্ত হন। দত্ত আঙ্গুনার হাজরা পরিবার-এর চালকল ও কয়লাখনির উদ্যোগ, সাথীনন্দীর পাঁজা পরিবারের ব্যবসা ও জমিতে বিনিয়োগ এবং বাঁকুড়ার সাহানা পরিবারের নানা বাণিজ্যিক কাজের কথা বলেছেন (পৃ. ৩০৮–৩১০)। সাধারণ ও দরিদ্র কৃষকদের ইতিহাসও এই বিবরণের অংশ; সুযোগ ও সম্পদ সকলের মধ্যে সমানভাবে বণ্টিত ছিল না।[১] অঞ্চল বিভাগে এই কাহিনির সঙ্গে গ্রাম, নদী ও বর্ধমানে আগুরী জনসংখ্যার ঐতিহাসিক কেন্দ্রীভবনের সম্পর্ক পাওয়া যাবে।
সমাজের সংগঠিত উদ্যোগ শিক্ষা ও সামাজিক সংস্কারকে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসে। দত্তের মতে, উগ্রক্ষত্রিয় সমিতি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৮৮ সালে। দরিদ্র শিশুদের শিক্ষায় সাহায্য, জানা ও সুতা বিভাগের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধি, পণপ্রথার বিরোধিতা এবং বিধবাবিবাহের সমর্থন ছিল তার কাজের অংশ (পৃ. ৩১১–৩১৩)।[১] এই উদ্যোগগুলি সম্পর্কে পড়ুন সংস্কৃতি ও সমাজজীবন বিভাগে।
ব্যক্তিত্ব ও ঐতিহ্য
আগুরীরা একটি ছোট সম্প্রদায়। ১৯৩১ সালের পর কোনো জনগণনায় তফসিলি জাতি ও জনজাতি ছাড়া বাংলার অন্য জাতিগুলি গোনা হয়নি, তাই তাঁদের বর্তমান সংখ্যা কেবল অনুমান করা যায়। শেষ যাচাই-করা জনগণনার সংখ্যা, ১৯২১ সালের ৬৮,৮১৬, থেকে প্রক্ষেপণ করলে আজ তাঁরা মোটামুটি ৩.২ লক্ষ: পশ্চিমবঙ্গের জনসংখ্যার প্রায় ০.৩২ শতাংশ।[১][৪] এমনকি বর্ধমানেও, যেখানে জমির মালিক হিসেবে তাঁরা স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন, ১৯১১ ও ১৯২১ সালের জনগণনায় তাঁরা ছিলেন জেলার জনসংখ্যার মাত্র ৪ শতাংশের কাছাকাছি।[১][৫]
সংখ্যায় কম হলেও বাংলার জনজীবনে, রাজনীতির নানা শিবিরে, আগুরীদের উল্লেখযোগ্য স্থান রয়েছে। বামপন্থী রাজনীতিতে বিনয় চৌধুরী ১৯৭৭ সাল থেকে বামফ্রন্ট সরকারের ভূমিসংস্কারে নেতৃত্ব দেন; তাঁর মৃত্যুর পর এক শ্রদ্ধাঞ্জলিতে তাঁকে জ্যোতি বসুর পরে পশ্চিমবঙ্গ মন্ত্রিসভার সবচেয়ে প্রবীণ সদস্য বলা হয়।[৬][১] কোঙার ভাইয়েরা সিপিআই(এম)-এর কৃষক আন্দোলন গড়ে তোলেন: হরেকৃষ্ণ কোঙার দুটি যুক্তফ্রন্ট সরকারেই ভূমি ও ভূমিরাজস্ব মন্ত্রী ছিলেন, আর বিনয়কৃষ্ণ কোঙার সর্বভারতীয় কৃষকসভার সভাপতি হন।[৭][৮][৯] কংগ্রেসে রাজ্যের মন্ত্রী যাদবেন্দ্রনাথ পাঁজা ১৯৫৮ থেকে ১৯৬১ সাল পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশ কংগ্রেস কমিটির সভাপতি ছিলেন।[১০] পরবর্তী দশকগুলিতে অজিতকুমার পাঁজার পরিবার প্রথমে কংগ্রেসে এবং পরে তৃণমূল কংগ্রেসে অগ্রণী ভূমিকা নেয়। অজিতকুমার পাঁজা কুড়ি বছর কলকাতা উত্তর-পূর্ব কেন্দ্রের সাংসদ ছিলেন এবং কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হন; তাঁর ভাই ডা. রণজিৎকুমার পাঁজা বারাসতের সাংসদ ছিলেন; আর তাঁর পুত্রবধূ ডা. শশী পাঁজা ২০১৩ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত রাজ্যের মন্ত্রী ছিলেন।[১১][১২][১৩][১৪] ২০২৬ সালের মে মাস থেকে আসানসোল দক্ষিণের বিধায়ক অগ্নিমিত্রা পাল, যিনি বিবাহসূত্রে একটি আগুরী পরিবারের সদস্য, রাজ্যের বিজেপি সরকারের মন্ত্রী।[১৫][১৬][১৭]
বাংলার সংস্কৃতিতেও এই সম্প্রদায়ের ছাপ রয়েছে। প্রতাপচন্দ্র রায় সম্পূর্ণ ইংরেজি মহাভারত প্রকাশ করেন; শক্তি সামন্ত আরাধনা থেকে অমানুষ পর্যন্ত হিন্দি ও বাংলা ছবি পরিচালনা করেন; সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত রমাপদ চৌধুরী ঔপন্যাসিক ও সম্পাদক হিসেবে আধুনিক বাংলা কথাসাহিত্যকে প্রভাবিত করেন; আর বাঁকুড়ার সত্যকিঙ্কর সাহানা কবিতা এবং সাহিত্য ও ধর্মবিষয়ক রচনা লেখেন।[১৮][১৯][২০][১] ব্যক্তিত্ব বিভাগে প্রত্যেকের জীবনের এবং, যেখানে পাওয়া গেছে, সম্প্রদায়গত যোগসূত্রের উৎস দেওয়া আছে।
যৌথ আচার ও গ্রামের পারস্পরিক সম্পর্কেও ঐতিহ্য বেঁচে থাকে। যেমন ক্ষীরগ্রামের যোগাদ্যা পূজা-র বিবরণে বিভিন্ন সমাজের অংশগ্রহণের মধ্যে আগুরীদের স্থানও দেখা যায়।[২১] সুপরিচিত মানুষের জীবনকথার পাশাপাশি দৈনন্দিন স্মৃতি সংরক্ষণেও এই সম্পর্কগুলি আমাদের উৎসাহিত করে।
ঐতিহ্যের পথে
এই ওয়েবসাইটে বাংলা বই, ঐতিহাসিক নথি ও গবেষণার ভিত্তিতে ইতিহাস, সংস্কৃতি, অঞ্চল ও জীবনচরিত একত্র করা হয়েছে। গবেষণা সংগ্রহে অচিন্ত্যকুমার দত্তের গবেষণা এবং বাংলার পরিবর্তনশীল সামাজিক জগৎ নিয়ে সুদর্শনা ভৌমিকের আলোচনা রয়েছে। রাজপুত ও উগ্রক্ষত্রিয়-এর বাংলা মূল ও ইংরেজি অনুবাদ পড়তে পারবেন; আছে নির্বাচিত রচনার পাঠসংগ্রহ। উগ্রক্ষত্রিয়-প্রতিনিধি-র খণ্ডগুলি এই বৃহত্তর সমাজ-ইতিহাসের সহায়ক উপকরণ হিসেবে সংরক্ষিত।
আপনি পারিবারিক ইতিহাস খুঁজতে আসুন, গ্রামের স্মৃতি ফিরে দেখতে আসুন বা প্রথমবার আগুরী সমাজকে জানতে আসুন—আপনাকে স্বাগত। উপরে ডানদিকে ভাষা নির্বাচন করে বাংলা বা ইংরেজিতে পড়ুন। ছবি, নথি বা স্মৃতি ভাগ করে নিতে চাইলে সহযোগিতার নির্দেশিকা দেখুন।






