বিপ্লবী বন্দি · কৃষক আন্দোলন · ভূমিসংস্কার
জীবন ও কাজ
১৯১৫–১৯৭৪ · কৃষক সংগঠক, বিধায়ক ও ভূমিমন্ত্রী
হরেকৃষ্ণ কোঙার ১৯১৫ সালের ৫ আগস্ট বর্ধমান জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। জন্মস্থান নিয়ে বিবরণে মতভেদ আছে: বিমান বসুর জন্মশতবর্ষের প্রবন্ধে মেমারির কথা আছে, উইকিপিডিয়ায় কামারগোড়িয়ার। বসু জানিয়েছেন, ১৯৩০ সালে পনেরো বছর বয়সে আইন অমান্য আন্দোলনের সময় তিনি প্রথম গ্রেপ্তার হন।[১][২]
তিরিশের দশকের গোড়ায় একটি বিপ্লবী মামলায় দণ্ডিত হয়ে তিনি আন্দামানের সেলুলার জেলে নির্বাসিত হন; সিপিআই(এম)-এর পত্রিকা অনুযায়ী তখন তাঁর বয়স আঠারো। জেলেই তিনি মার্কসবাদে আকৃষ্ট হয়ে কমিউনিস্ট কনসলিডেশন গোষ্ঠীতে যোগ দেন। ১৯৩৮ সালে মুক্তির পর ভারতের কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেন।[১][৩]
উইকিপিডিয়ার জীবনী অনুযায়ী তিনি ১৯৩৩ সালের এপ্রিলে সেলুলার জেলে পৌঁছন এবং সে বছর ১২ মে জেলের অবস্থার প্রতিবাদে শুরু হওয়া অনশনে যোগ দেন। জোর করে খাওয়ানোর পরে তিন বন্দি — মহাবীর সিং, মোহনকিশোর নমোদাস ও মোহিত মৈত্র — মারা যান; ৪৬ দিন পরে, ২৬ জুন, কর্তৃপক্ষ কুঠুরিতে আলো, বিছানা ও পড়াশোনার অধিকার-সহ দাবিগুলি মেনে নিলে অনশন শেষ হয়। একই বিবরণে ১৯৩৫ সালে বন্দিদের মধ্যে কমিউনিস্ট কনসলিডেশন গড়ে তোলার কৃতিত্ব কোঙারকে দেওয়া হয়েছে। ১৯৩৭ সালের ৯ জুলাই তিনি ও শিব বর্মা ভাইসরয়ের কাছে আবেদন পাঠান, এবং ২৫ জুলাই রাজবন্দিরা দ্বিতীয় দফায় গণ-অনশন শুরু করেন। অনশন চলে ৩৬ দিন; আগস্টে গান্ধীজি, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির আবেদনের পর তা শেষ হয়, এবং সরকার আন্দামানের বন্দিদের মূল ভূখণ্ডের জেলে ফেরানো শুরু করে। ১৯৩৮ সালের ২৭ মার্চ কোঙার মুক্তি পান।[২]
তাঁর রাজনৈতিক ভিত্তি ছিল গ্রামীণ বর্ধমান। বসুর বিবরণে ক্যানাল করের বিরুদ্ধে সংগঠন এবং ১৯৪৪ সালের অজয় নদের বাঁধ আন্দোলনে তাঁর নেতৃত্বের কথা আছে। ১৯৫৭ সালে, কালনা কেন্দ্র যখন দুজন সদস্য নির্বাচন করত, কোঙার সেখান থেকে বিধায়ক হন; পরে ১৯৬২, ১৯৬৭, ১৯৬৯ ও ১৯৭১ সালেও জেতেন এবং ১৯৭২-এ আসনটি হারান। ১৯৬৪ সালের পার্টি-বিভাজনের পর তিনি সিপিআই(এম) ও তার কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ছিলেন।[১][৪]
দুটি যুক্তফ্রন্ট সরকারেই তিনি ভূমি ও ভূমিরাজস্ব মন্ত্রী ছিলেন: ১৯৬৭ সালের ১ মার্চ থেকে ২১ নভেম্বর, এবং ১৯৬৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৯৭০ সালের ১৬ মার্চ। কোঙার যাঁকে ভূমি-নথি ও জরিপের অধিকর্তা নিযুক্ত করেছিলেন, সেই দেবব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় গোপনে বা বেনামে রাখা সিলিং-উদ্বৃত্ত জমি খাস করার সরকারি উদ্যোগের বিবরণ দিয়েছেন। ভাই বিনয় কোঙারের কথায়, হরেকৃষ্ণ মনে করতেন কেবল প্রশাসনের মাধ্যমে ভূমিসংস্কার সম্ভব নয়। তাই আইনি প্রক্রিয়ার পাশাপাশি কৃষক কমিটিগুলি এমন জমি চিহ্নিত ও দখল করত।[২][৫][৬]
১৯৬৭ সালের নকশালবাড়ি অভ্যুত্থান এই পথের পরীক্ষা নেয়। শিলিগুড়ির কাছে কোঙার কানু সান্যালের সঙ্গে আলোচনা করেন, কিন্তু সমঝোতা কার্যকর হয়নি এবং পরে পুলিশি অভিযান হয়। বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিবরণে কোঙারের মত ছিল, দমননীতি আন্দোলনকে ছড়িয়ে দেবে, আর গরিব কৃষকের জমির ক্ষুধা মেটালেই তা দুর্বল হবে। বিদ্রোহীদের প্রতি সহানুভূতিশীল একটি সমসাময়িক বিবরণ তাঁকে অন্যভাবে দেখায়; সেখানে একটি সংবাদপত্রের প্রতিবেদন উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, তিনি তাঁদের দমনযোগ্য “ডাকাত” বলেছিলেন।[৭][৫][৮]
১৯৬৮ বা ১৯৬৯ সালে (সূত্রভেদে) কোঙার সর্বভারতীয় কৃষকসভার সাধারণ সম্পাদক হন এবং ১৯৭৪ সালের ২৩ জুলাই কলকাতায় ক্যানসারে মৃত্যু পর্যন্ত সেই পদে ছিলেন।[১][২]
মূল্যায়ন ও বিতর্ক
১৯৬৭–৭০-এর জমি আন্দোলনের পরিমাপ নিয়ে ভিন্ন হিসাব আছে। উইকিপিডিয়ার প্রায় দশ লক্ষ একরের হিসাব আইনি প্রক্রিয়ায় খাস হওয়া জমির; অতীগ ঘোষের উদ্ধৃত একটি তুলনায় কৃষক কমিটিগুলির হাতে প্রায় তিন লক্ষ একর জমি আসার কথা বলা হয়েছে। ঘোষ এই তুলনা দিয়ে দেখান যে পরে সিপিআই(এম) আন্দোলনের বদলে প্রশাসনের উপর নির্ভর করেছিল। আরিল্ড এঙ্গেলসেন রুড বর্ধমানের গ্রামে গবেষণা করে দলের গ্রামীণ সমর্থনকে বিভিন্ন স্তরের কৃষকের জোট দিয়ে ব্যাখ্যা করেছেন। রুড লিখেছেন, দ্বিতীয় যুক্তফ্রন্ট সরকারের সময় কোঙার কৃষকদের নিজেরাই বেআইনিভাবে রাখা জমি দখল করতে এবং নথিভুক্তির কাজ পরে আধিকারিকদের হাতে ছেড়ে দিতে বলেন; তিনি আন্দোলনের “ভুল ও বাড়াবাড়ি”-কে কোঙারের ভাষায় “সাধারণ গ্রামীণ রাজনীতি” বলে উদ্ধৃত করেছেন। রুডের রায়নার গবেষণা-গ্রামে মাত্র প্রায় ১৫ বিঘা জমি পুনর্বণ্টিত হয়, বেশিরভাগই অলাভজনক ছোট টুকরোয়, যা প্রাক্তন মালিকেরা অচিরেই আদালতের নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনেন (পৃ. ১০৬, ১১১–১১২, ১১৬)।[৯] জমি দখল জমির মালিকদের সঙ্গে সংঘাতও ডেকে আনে, আর বিনয় কোঙার পরে সংবিধানের কাঠামোর মধ্যে ভূমিসংস্কারের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করেছেন।[২][১০][৬]
কোঙারের জীবনের বিস্তারিত বিবরণগুলির বেশিরভাগ দলীয় সহকর্মী ও পরিবারের সদস্যদের লেখা; সেভাবেই সেগুলি পড়া উচিত। পূর্ণাঙ্গ স্বাধীন জীবনী পাওয়া যায়নি। সম্প্রদায়গত পরিচয়ের ভিত্তি দত্তের Explorations in Colonial Bengal-এর ৩১৪ পৃষ্ঠা, যেখানে তিনি উগ্রক্ষত্রিয় স্বাধীনতা সংগ্রামীদের মধ্যে হরেকৃষ্ণ কোঙারের নাম করেছেন; পদবি থেকে তা অনুমান করা হয়নি।[১১]

